প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে চুলপড়া বন্ধ করার সহজ উপায়

প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে চুলপড়া বন্ধ করার সহজ উপায়

প্রাকৃতিক, পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়ামুক্ত উপাদান ব্যবহার করে চুলপড়া বন্ধ করার উপায় সমূহ বিশদভাবে আলোচনা করা হয়েছে।

যে কোনো সমস্যা সমাধানে সমস্যা কোথায় সেটি জেনে নেওয়া জরুরী। সাধারনত চুল পড়ে থাকে পুষ্টির অভাব হলে, অতিরিক্ত টেনশন করলে, পর্যাপ্ত ঘুম না হলে। উক্ত সমস্যা থাকলে চুলপড়া স্বাভাবিক। চুলপড়া রোধে জরুরী পর্যাপ্ত পুষ্টি, সুষম খাবার, শরীরচর্চা ও ৭ – ৮ ঘন্টা ঘুম।

১। পেয়ারা পাতা ব্যবহার করে চুলপড়া বন্ধ করার উপায়

পেয়ারাতে রয়েছে ভিটামিন সি, পটাসিয়াম, ফাইবার, লাইকোপিন এবং আরো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এছাড়াও, পেয়ারা পাতায় আরও রয়েছে অ্যান্টি ইনফ্লেমেটরি, অ্যান্টি অক্সিডেন্ট, অ্যানালজেসিক এবং অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়াসহ আরো নানা ধরনের নিরাময়ক উপাদান।

পেয়ারা পাতা চুলপড়া, চুলের দ্রুত বৃদ্ধিতে এবং মাথার ত্বক সুরুক্ষিত রাখতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। এটা ব্যবহার করলে চুল নরম ও ঝলমলে হয়ে ওঠে।

পেয়ারা পাতার ব্যবহার প্রনালী নিচে দেওয়া হলো

পাত্রে পরিমাণ মতো পানি নিয়ে ফুটিয়ে নিন। পানি ফুটে গেলে ৫-৭ টি পেয়ারা পাতা ছেড়ে দিন। পেয়ারা পাতাসহ ১৫-২০ মিনিট ফুটিয়ে নিন। পাতা ফেলে দিয়ে, ভালো করে ছেকে নিন। এবং ঠান্ডা হওয়ার পর তেল দেওয়ার মতো হালকা ঘসে মাথায় ব্যবহার করুন।

চুলে শ্যাম্পু করে উক্ত প্রনালীটি ব্যবহার করতে হবে। চুল দ্রুত লম্বা ও ঝলমলে করতে চাইলে সপ্তাহে ২ বার ব্যাবহার করুন এবং চুল পরা দূর করতে সপ্তাহে ৩ বার ব্যবহার করুন।

২। চুলপড়া বন্ধ করতে অ্যালোভেরার ব্যবহার

অ্যালোভেরাতে আছে ভিটামিন, প্রোটিন, ও মিনারেল। এনজাইম চুলের বৃদ্ধি ঘটাতে সাহায্য করে। অ্যালোভেরাতে এনজাইমের পরিমাণ খুব বেশি থাকে।

চুল পরা বন্ধ করতে ও চুলের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে অ্যালোভেরা অনেক বেশি সাহায্য করে। অ্যালোভেরার গুনাবলির কথা বলে শেষ করা যাবে না। তাই আসুন দেরি না করে জেনে নেই কিভাবে ব্যবহার করবেন।

যেভাবে অ্যালোভেরা ব্যবহার করবেনঃ

★ বাজারে যে জেল পাওয়া যায় সেটা সম্পুর্ন খাঁটি না। এতে অনেক ভেজাল মিশ্রিত থাকে। তাই সবচেয়ে ভালো হয় যদি অ্যালোভেরা কিনে এর জেল বের করে ব্যবহার করতে পারেন।

তেল দেওয়ার মতো করে আঙ্গুলের মাথায় অ্যালোভেরা নিয়ে আলতো ঘষে মাথায় লাগান। এক ঘন্টা অপেক্ষা করে শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। এটা হলো অ্যালোভেরার খুবই সহজ ব্যবহার। ভালো ফল পেতে সপ্তাহে দুই দিন অ্যালোভেরার মিশ্রন ব্যবহার করুন।

★ অ্যালোভেরার সাথে, নারিকেল তেল, ক্যাস্টর তেল, ও মধু একসাথে মিশিয়ে একটি মিশ্রণ বানিয়ে নিন। মিশ্রণটি ফ্রিজে ৫ মিনিটের মতো রেখে দিন। ৫ মিনিট পর বের করে ২-৩ মিনিট অপেক্ষা করে আলতো ঘষে মাথায় লাগিয়ে নিন।

এটি সারা রাত রাখতে পারেন, পরদিন শ্যাম্পু করে নিবেন। এই মিশ্রণটি চুল পরা রোধে ও চুল লম্বা করতে দারুন কার্যকর।

★ অ্যালোভেরার সাথে পেয়াজের রস ও লেবুর রস পরিমাণ মতো মিশিয়ে ২০-৩০ মিনিট লাগিয়ে রাখতে হবে। ভালো ফল পেতে সপ্তাহে ২-৩ বার মিশ্রণটি ব্যবহার করুন।

৩। অলিভ অয়েলের ব্যবহার করে চুলপড়া বন্ধ করার উপায়

অলিভ অয়েলে রয়েছে অলেয়িক এসিড যা চুল পরা কমাতে সাহায্য করে। সম্পুর্ণ প্রাকৃতিক এই তেলটিতে থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট চুলের গোড়ার রেডিকেল ড্যামেজ থেকে রক্ষা করে।

চুলে ক্যামিকেল ব্যবহারের পরিবর্তে অলিভ অয়েল বেশি কার্যকরী ভুমিকা রাখে। চুল পরা সমস্যা সমাধানে তিনটি অলিভ অয়েলের উপকারী হেয়ার প্যাক তৈরি করার নিয়মাবলি নিম্নে দেওয়া হলোঃ

★ অলিভ অয়েল, দারুচিনি গুড়ো, মধু, এই তিনটি উপাদান একত্রিত করে খুব ভালোভাবে মিশিয়ে নিতে হবে। এবং ২০ মিনিট রেখে শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে।

দারুচিনি ত্বকের রক্ত প্রবাহ ত্বরান্বিত করে। যার ফলে চুল পরার মাত্রা অনেকাংশে কমে আসে। মধু ত্বক সুস্থ ও পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে।

★ চুল পরা সমস্যায় আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে আদার ব্যবহার লক্ষনীয়। আদার পেস্ট, অলিভ অয়েল, নারিকেল তেল একসাথে মিশিয়ে চুলের গোরায় ম্যাসাজ করুন এবং ৩০ মিনিটের জন্য রেখে দিন।

এরপর, ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে নিন। আদার মিশ্রন ব্যবহার করার পর শ্যাম্পু ব্যবহার করবেন না।

★ ডিমের সাদা অংশের সাথে অলিভ অয়েল মিশিয়ে প্যাক বানিয়ে নিন। এবং খুব ভালো করে ঘষে ৩০ মিনিটের জন্য রেখে পরবর্তীতে শ্যাম্পু দিয়ে চুল ধুয়ে নিন। ডিম সরাসরি ত্বকের ভিতর দিয়ে চুলের গোরায় পুষ্টি যোগায়। মিশ্রণটি সপ্তাহে দুইবার ব্যবহার করুন।

৪। আমলকির ব্যবহার করে চুলপড়া বন্ধ করার উপায়

এতে রয়েছে এসকরবিক এসিড। এটি চুলে টনিক হিসেবে কাজ করে থাকে। আরও রয়েছে খনিজ, মিনারেল ও ভিটামিন। যা চুলের গোঁড়া মজবুত, চুল পরা রোধ ও চুলের বৃদ্ধিতে বিশেষ ভুমিকা রাখে।

আমলকি বা অলিভ অয়েল মাথার চুলের গোঁড়ায় মালিশ করুন। এতে করে চুলের ফলিকল মজবুত হয়ে উঠবে। যার ফলে চুল পরা কমতে থাকবে।

নিয়মিত আমলকির তেল ম্যাসাজ করলে স্ক্যাল্পের রক্ত চলাচল ভালো হয়। এতে থাকা অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল গুণ চুলকানির সাথে খুসকিও দূর করে থাকে।

আমলকির তেল মাথায় ব্যবহার করার আগে হালকা গরম করে নেওয়া ভালো। যাদের অতিরিক্ত চুল পড়ছে, তাদের তেলটি সপ্তাহে দুই থেকে তিনবার ব্যবহার করতে হবে।

চুল পরা নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য টাটকা আমলকি রস ব্যবহার করুন এবং ১০ মিনিটের মতো অপেক্ষা করে হালকা গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। এটি কোলাজেনের মাত্রা বৃদ্ধি করার পাশাপাশি চুল পরাও কমাবে।

নিম্নে বর্ণিত হেয়ার মাস্কটি ব্যবহার করলে আশানুরূপ ফল পাবেন-

★ আমলকি পেস্ট বানিয়ে সাথে ২/১ চামচ গরম জল মিশিয়ে কিছুক্ষণ নেড়ে ১ চামচ মধু ও ২ চামচ টক দই ভালোভাবে মিশিয়ে পেস্ট বানিয়ে নিন। এরপর চুলে ঘষে ঘষে লাগান এবং আধঘন্টা রেখে হালকা গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।

৫। মেথি ব্যবহার করে চুলপড়া বন্ধ করার উপায়

চুল বিষয়ক যে কোনো সমস্যায় মেথির ব্যবহার অনেক কার্যকরী। মেথিতে রয়েছে নিকোটিনিক এসিড ও প্রোটিন। এই উপাদানগুলো চুলকে মজবুত করে ও ভিতর থেকে পুষ্টি যোগায়৷

মেথিতে লেসিথিনের পরিমান খুব বেশি। লেসিথিন চুলের পুষ্টি যোগায়, চুল গজাতে, চুলের বৃদ্ধিতে অনেক বেশি ভুমিকা রাখে।

মেথি ও সরিষা পাউডার করে তিন চামচের মতো পানি দিয়ে ৪০ মিনিটের মতো ভিজিয়ে রাখুন। তারপর ২/১ চামচ অলিভ অয়েল মিশিয়ে পেস্ট বানিয়ে মাথার ত্বকে ম্যাসাজ করুন। ২০ মিনিট রেখে শ্যাম্পু দিয়ে ধুঁয়ে ফেলুন। প্যাকটি মাসে ২ বার ব্যববহার করতে পারেন।

চুলের সুরক্ষায় মেথি দিয়ে আরো যা যা করতে পারেন –

★ এক মুঠো মেথি এক গ্লাস পানিতে ৫-৭ ঘন্টা ভিজিয়ে রেখে ছেঁকে নিয়ে নিয়মিত পানি পান করলে অনেক দ্রুত উপকার পাওয়া যায়।

এতে থাকা নিকোটিনিক এসিড ও প্রোটিন ভেতর থেকে চুলের পুষ্টি যোগায় এবং মজবুত করে। যার ফলে চুল পরা দ্রুত কমতে থাকে।

★ মাথায় অনেক বেশি খুশকি হলে অনেক সময় চুল আশঙ্কাজনিত হারে পরতে থাকে। এই সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে পরিমাণ মতো মেথি পানিতে ৫/৬ ঘন্টা ভিজিয়ে রেখে পেস্ট বানিয়ে নিন।

এতে যোগ করুন ৩ চামচ টকদই। প্যাকটি ভালোভাবে লাগিয়ে ৩০ মিনিট অপেক্ষা করুন এবং শ্যাম্পু করে ফেলুন। এই প্যাকটি সপ্তাহে ২/১ বার ব্যবহার করলে আশানুরূপ ফল পাবেন।

এছাড়াও একদম ঝঞ্জাট মুক্ত উপায়ে মেথি ভিজিয়ে সরাসরি মাথায় লাগাতে পারেন! অথবা মেথি ভেজানো পানিটা স্প্রে করতে পারেন গোসলের আগে।

৬। নিম পাতা ব্যবহার করার মাধ্যমে চুলপড়া বন্ধ করার উপায়

ঔষুধি গুনাগুন সমৃদ্ধ নিম পাতার উপকারিতা কম বেশি আমরা সবাই জানি। নিমে আছে অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়াল উপাদান, যা খুব সহজেই জীবাণু দূর করে থাকে। এর ফলে খুসকি ও চুল পরা নিয়ন্ত্রণে আসে। আসুন জেনে নেই- নিম পাতা কিভাবে ব্যবহার করলে চুল পরা থেকে রেহাই পাওয়া যাবে-

★ নিম পাতা খুব ভালোভাবে পানিতে ফুটিয়ে নিন। যখন সব রস বেরিয়ে যাবে তখন পানিটা নামিয়ে ছেঁকে নিন। এবং সাথে যোগ করুন ২ চামচ অ্যালোভেরা জেল।

খুব ভালোভাবে মেশানো হয়ে গেলে ঘষে ঘষে সমগ্র চুলে লাগান এবং আধঘন্টা পর ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে নিন। সপ্তাহে ২ দিন ব্যবহার করলে খুব দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসবে চুল পরা।

★ নিমপাতা বেটে সপ্তাহে একবার ব্যবহার করতে পারেন। একঘন্টা রেখে ধুয়ে ফেলুন। এটি চুল পরা কমাবে। সাথে ঝলমলে ভাব এনে দিবে।

★ নিমপাতা থেঁতো করে, এর রস বের করে নিন। সাথে ২/৩ চামচ মধু, আমলকির রস, লেবুর রস ও ২ চামচ অ্যালোভেরা মিশিয়ে নিন। একঘন্টা রেখে ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। সপ্তাহে ২ বার, টানা একমাস এই মিশ্রণ ব্যবহার করলে আশানুরূপ ফল পাবেন।

৭। মেহেদী পাতা ব্যবহার করে চুলপড়া বন্ধ করার উপায়

মেহেদী ভেষজ গুনাগুনে সমৃদ্ধ। এটি চুলের খুশকি, শুষ্ক ভাব, আগা ফাটা কমায় ও চুল পরা নিয়ন্ত্রণে আনে। মেহেদী ব্যবহার করলে চুলের গোড়া শক্ত হয়। মেহেদীর কিছু ঘরোয়া প্যাক নিচে দেওয়া হলোঃ

★ ডিমের সাদা অংশ, ৩ চামচ অলিভ অয়েল ও পরিমাণ মতো মেহেদী বাটা মিশিয়ে মিশ্রনটি আঙ্গুলের ডগায় নিয়ে আলতো ঘষে ম্যাসাজ করুন। এর একঘন্টা পর ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।

প্যাকটি ব্যবহারের ফলে চুলের গোরা মজবুত হবে ও চুলপড়া কমবে। সপ্তাহে ২ বার ব্যবহার করুন।

★ মেহেদী বাঁটা, টকদই, ও লেবুর রস একসাথে মিশিয়ে মিশ্রনটি মাথায় লাগান ও আধঘন্টা পর ঠান্ডা পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে নিন। সপ্তাহে ১ বার ব্যবহার করুন।

★★ মেহেদী বাটা, মেথি বাটা ও অলিভ অয়েল একসাথে মিশিয়ে একটি মিশ্রন বানিয়ে নিন। মিশ্রনটি মাথায় লাগিয়ে ১ ঘন্টা অপেক্ষা করে কুসুম গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। সপ্তাহে ২-১ বার ব্যবহার করতে পারেন।

উপরোক্ত যে কোনো একটির ব্যবহার বিধি অনুসরণ করে নিয়মিত ব্যবহার করলে চুল পরা থেকে খুব দ্রুত পরিত্রাণ পেতে পারেন।

এছাড়াও কিছু টিপস শেয়ার করছি যেগুলো মেনে চললে চুল পরা অনেকাংশে কমে যাবে।

  • ভেজা অবস্থায় কখনোই চুল আচড়াবেন না। এই সময় চুল অনেক নরম অবস্থায় থাকে। যার ফলে খুব সহজেই ভেঙে যেতে পারে। তাই ভেজা অবস্থায় চিরুনি ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন।
  • চুল আলতো করে মুছুন। জোরে ঘষামাজা করে মুছলে গোড়া থেকে ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। শক্ত করে বেনী করা থেকে বিরত থাকুন।
  • চুলে নিয়মিত তেল দিন। ও স্বাস্থ্যকর খাবার খান বেশি বেশি। বিশেষ করে শাকসবজি ও ফলমূল বেশি করে খান।
    তেলের সাথে ভিটামিন ই ক্যাপসুল চুলে মিশিয়ে নিয়মিত ব্যবহার করুন।

লিখেছেন- মিম হিয়া

আরও পড়ুন-