কন্ডিশনার ব্যবহারের সঠিক নিয়ম এবং এর প্রকারভেদ

শুষ্ক, রুক্ষ চুলকে মসৃণ ও ঝলমলে করে তুলতে শ্যাম্পুর পর কন্ডিশনার অবশ্যই চাই তাই না? কিন্তু অনেক সময় দেখা যায় কন্ডিশনার ব্যবহারে চুলতো ঝলমলে হয়-ই না বরং তার উপর শুরু হয়ে যায় চুল পড়া। এই বিপত্তির কারণ কী জানেন? কন্ডিশনারের ব্যবহারের সঠিক নিয়ম না জানা। আজ তবে বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক কন্ডিশনার ব্যবহারের সঠিক নিয়ম সম্পর্কে।

কন্ডিশনার ব্যবহারের সঠিক নিয়ম জানা প্রয়োজন কেন?

চুলে লেগে থাকা ধুলো-ময়লা পরিষ্কার করার পাশাপাশি শ্যাম্পু আমাদের চুলের আর্দ্রতাও শুষে নেয়। এছাড়া অধিকাংশ শ্যাম্পুই এমন সব উপাদান দিয়ে তৈরি যা আমাদের হেয়ার শাফট (চুলের বাইরের আবরণ) কে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং এই ক্ষতির পরিমাণ কিন্তু মোটেও কম নয়! যার ফলে চুল হয়ে যায় প্রচুর রুক্ষ ও ফ্রিজি।

কন্ডিশনার চুলের এই রুক্ষতা দূর করে চুলকে করে তোলে সফট, সিল্কি ও ফ্ল্যাক্সিবল। যার ফলে যেকোন হেয়ার স্টাইলের জন্যই আপনার চুল হয়ে ওঠে একদম উপযুক্ত।

চুপসে যাওয়া চুলে ভলিউম আনতে কন্ডিশনার দারুন কাজ করে। এছাড়া প্রতিদিনের রোদ বা তাপে চুলের যে ক্ষতি হয় তা সারিয়ে তুলতেও কন্ডিশনার কিন্তু অনেকটা কার্যকরী।

কন্ডিশনার ব্যবহারে চুল হয়ে ওঠে ঝলমলে ও স্বাস্থ্যোজ্জ্বল। এছাড়া চুলে জট পাকিয়ে যাওয়া নিয়েও আর ভয় থাকে না। দুই একদিন কন্ডিশনার ব্যবহার করা না হলে তেমন কোন সমস্যায় পড়তে হয় না। কিন্তু প্রতিদিন এই ভুল হলে আপনার ঝলমলে চুলের সৌন্দর্য হারিয়ে যেতে খুব বেশিদিন সময় লাগবে না!

কন্ডিশনার ব্যবহারের সঠিক নিয়ম জানা না থাকলে উপকারিতার ছিটেফোঁটাও আপনার ভাগ্যে জুটবে না। রুক্ষ-শুষ্ক চুলের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়া তো দূর বরং পড়ে যাবেন হেয়ার ফলের অসহ্য যন্ত্রণায়। এভাবে চলতে থাকলে চুলের সৌন্দর্য বাড়াতে গিয়ে হারিয়ে ফেলতে পারেন প্রিয় চুলগুলোই!

চুলের ধরণ বুঝে কন্ডিশনার

আমাদের কারো চুল শুষ্ক কারো আবার তৈলাক্ত। অনেকের চুল হয় স্বাভাবিক প্রকৃতির। কেউ কেউ আবার চুলে রিবন্ডিং বা কালার করান। এই ধরণভেদে চুলের জন্য প্রয়োজনীয় এবং ক্ষতিকর উপাদানের মধ্যেও আছে ভিন্নতা।

বুঝতেই পারছেন, সকলের মধ্যে চুলের ধরণেই যেখানে বিরাট পার্থক্য সেখানে কন্ডিশনার নিশ্চই এক হবে না।

চুলের জন্য উপযুক্ত কন্ডিশনার বেছে নিতে হবে চুলের ধরণ অনুযায়ী। চুল এবং স্কার্ল্ফ প্রধানত ৫ ক্যাটাগরির।

  • শুষ্ক
  • তৈলাক্ত
  • স্বাভাবিক
  • ড্যামেজড
  • হেভিলি স্টাইলড

ড্রাই/শুষ্ক চুল ও স্কার্ল্ফ

শুষ্ক চুলের জন্য প্রয়োজন সালফার ফ্রি এবং ময়েশ্চার ও প্রোটিন সমৃদ্ধ কন্ডিশনার। ভিটামিন ই, অ্যালোভেরা সমৃদ্ধ কন্ডিশনারও এক্ষেত্রে ভালো কাজ করে।

অয়েলি/তৈলাক্ত চুল ও স্কার্ল্ফ

আপনার চুলের ধরণ যদি তৈলাক্ত হয় তবে এমন কন্ডিশনার ব্যবহার করতে হবে যেটাতে ফ্যাটি এসিডের পরিমাণ খুবই কম।

মিশ্র/স্বাভাবিক চুল ও স্কার্ল্ফ

স্বাভাবিক চুলের জন্য লিভ-ইন কন্ডিশনারই সবচেয়ে ভালো। এছাড়া স্বাভাবিক স্কার্ল্ফ হওয়া সত্বেও কোকড়ানো চুল হলে চুলের আগা পর্যন্ত স্কার্ল্ফের তেল এসে পৌঁছায় না। তাই এ ধরনের চুলের জন্য প্রয়োজন ময়েশ্চার সমৃদ্ধ কন্ডিশনার। এক্ষেত্রে জোজোবা অয়েল, অ্যাভোকাডোস সমৃদ্ধ কন্ডিশনার ব্যবহার করা যেতে পারে।

ড্যামেজড চুল

চুল পাতলা, ভঙ্গুর বা নিষ্প্রাণ হলে ময়েশ্চার সমৃদ্ধ কন্ডিশনার ব্যবহার করা সবচেয়ে নিরাপদ। এক্ষেত্রে চুলে ভলিউম আনবে এমন কন্ডিশনারই ব্যবহার করা উচিত।

প্রয়োজন মনে হলে পড়ে নিতে পারেন-

হেভিলি স্টাইলড হেয়ার

অনেকে চুলে প্রতিনিয়ত ব্লো ড্রাই, স্ট্রেইটনার, কার্লার ব্যবহার করেই চলেছেন। হেয়ার কালার বা হেয়ার রিবন্ডিং করার হারও বাড়ছে দিন দিন। এসবের ফলে চুলের যে ক্ষতি হয় তা সাধারণ কন্ডিশনার রিকভার করতে পারে না।

এক্ষেত্রে এসব স্টাইল করা চুলের জন্য ময়েশ্চার সমৃদ্ধ এবং কালার বা রিবন্ডিং করা চুলের জন্য বাজারে আলাদা যে কন্ডিশনারগুলো পাওয়া যায় সেগুলো ব্যবহার করাই সবচেয়ে বেশি নিরাপদ।

প্রকারভেদ এবং কন্ডিশনার ব্যবহারের সঠিক নিয়ম

কন্ডিশনার সাধারণত ৩ ধরণের।

  • ট্রাডিশনাল কন্ডিশনার
  • লিভ-ইন কন্ডিশনার
  • ডিপ কন্ডিশনার

এখানে আবার গুলিয়ে ফেলবেন না যেন! প্রকারভেদগুলোর ক্ষেত্রে এমন নয় যে আপনি শুষ্ক চুলের জন্য ট্রাডিশনাল বা তৈলাক্ত চুলের জন্য লিভ-ইন কন্ডিশনার ব্যবহার করবেন। এগুলোর ভিন্নতা মূলত ব্যবহারের নিয়মে। আসলে এখানে ট্রাডিশনাল, লিভ-ইন আর ডিপ কন্ডিশনার ব্যবহারের নিয়ম ভিন্ন বলেই এদের আলাদা ক্যাটাগরিতে ফেলা হয়েছে।

ট্রাডিশনাল কন্ডিশনার ব্যবহারের সঠিক নিয়ম

সবসময় ব্যবহারের জন্য ট্রাডিশনাল কন্ডিশনার সবচেয়ে ভালো। এ ধরনের কন্ডিশনার হট টুলস্ ও ক্যামিকেলস থেকে এবং একই সঙ্গে চুলে স্বাভাবিকভাবে সৃষ্ট ক্ষতি থেকে চুলকে রক্ষা করে। তবে এক্ষেত্রে চুলের ধরণ অর্থাৎ চুল শুষ্ক, কার্লি, ফ্রিজি বা ড্যামেজড যেকোনটির জন্য উপযুক্ত ট্রাডিশনাল কন্ডিশনারটি বেছে নিতে হবে।

ব্যবহারের পদ্ধতি
  1. চুল শ্যাম্পু দিয়ে খুব ভালো করে পরিষ্কার করে নিন। এক্ষেত্রে সবসময়ই ঠান্ডা পানি ব্যবহার করুন। গরম পানির চেয়ে ঠান্ডা পানি চুলকে বেশি ভালো রাখে এবং সেইসঙ্গে চুলের ড্যামেজও রোধ করে। চুল থেকে শ্যাম্পু ঠিকমতো দূর হয়েছে কিনা দেখে নিন।
  2. চুল নিংড়ে অতিরিক্ত পানি ঝরিয়ে ফেলুন।
  3. এবার পরিমাণ মতো কন্ডিশনার হাতের তালুতে নিয়ে ভেজা চুলেই আগা থেকে গোড়ার দিকে লাগাতে থাকুন।
  4. কন্ডিশনার লাগানোর সাথে সাথেই ধুয়ে ফেলবেন না। একে সেট হতে ১-২ মিনিট সময় দিন।
  5. এরপর ঠাণ্ডা পানি দিয়ে চুল খুব ভালোভাবে ধুয়ে ফেলুন।
  6. এবার চুল নিংড়ে চুলের অতিরিক্ত পানি ঝরিয়ে নিন।

ধুয়ে ফেলার পর যদি আপনার চুলে চিটচিটে বা আঠালো ভাব থেকে যায় তার মানে কন্ডিশনার ভালো করে সেট হয়নি। আর যদি চুল মসৃণ ও পিচ্ছিল হয় তবে অভিনন্দন! আপনার কন্ডিশনিং সফল হয়েছে।

লক্ষ্য রাখুন: কন্ডিশনার যেন কিছুতেই মাথার তালু বা স্কার্ল্ফে না লাগে। এটাই মূলত কন্ডিশনার ব্যবহারে চুল পড়া সমস্যার কারণ। প্রতিটি চুলেই কন্ডিশনার যেন ঠিকমতো পৌঁছায় সেদিকে বিশেষ নজর দিন। চুল নিংড়ে পানি ঝরানোর সময় চুলে বেশি চাপ বা হেঁচকা টান দেবেন না। এতে চুল আরো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

লিভ-ইন কন্ডিশনার ব্যবহারের সঠিক নিয়ম

বাজারে সাধারণত ২ ধরণের লিভ-ইন কন্ডিশনার পাওয়া যায়।

  • ক্রিম
  • স্প্রে-অন

আপনার চুলের ধরণ বুঝে যেকোনটি বেছে নিতে পারেন। ঘন, লম্বা ও কার্লি চুলের জন্য ক্রিম এবং পাতলা ও স্ট্রেইট চুলের জন্য স্প্রে টা ভালো।

ব্যবহারের পদ্ধতি

লিভ-ইন কন্ডিশনার ব্যবহারের সঠিক নিয়ম অনুযায়ী এটি ভেজা চুলে ব্যবহারের কোন প্রয়োজন নেই। এমনকি কন্ডিশনার লাগানোর পর তা ধুয়ে ফেলারও কোন প্রয়োজন পড়ে না।

  1. হাতের তালুতে পরিমাণ মতো কন্ডিশনার নিয়ে নিন।
  2. শুকনো চুলে গোড়া থেকে আগা পর্যন্ত ঘষে ঘষে কন্ডিশনার লাগান।
  3. এবার মোটা দাঁতের চিরুনি দিয়ে চুল ভালো করে আঁচড়ে নিন।

লক্ষ্য রাখুন: ট্রাডিশনাল কন্ডিশনারের মতো এটিও মাথার তালুতে লাগানো যাবে না। চুলের আগার ক্ষতিগ্ৰস্থ এরিয়ায় খুব ভালো করে লাগান। প্রতিটি চুলই যেন কন্ডিশনার পায় সেদিকে খেয়াল রাখুন।

ডিপ কন্ডিশনার ব্যবহারের সঠিক নিয়ম

অন্যান্য কন্ডিশনারের মতো ডিপ কন্ডিশনারও রুক্ষ, ক্ষতিগ্ৰস্থ চুলের উজ্জ্বলতা ও সফটনেস ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে। জানিয়ে রাখি, ডিপ কন্ডিশনারের কোন প্রকারভেদ নেই কিন্তু বিভিন্ন ব্রান্ড আছে। আপনার বাজেট ও প্রয়োজন অনুযায়ী যেকোনটি বেছে নিতে পারেন।

ব্যবহারের পদ্ধতি
  1. ঠান্ডা বা গরম পানিতে চুল ভিজিয়ে নিন (ঠান্ডা পানি ব্যবহারই সবচেয়ে ভালো)। আপনি চাইলে শ্যাম্পুও করে নিতে পারেন।
  2. চুলের অতিরিক্ত পানি আলতো চাপে নিংড়ে নিন।
  3. হাতের তালুতে পরিমাণ মতো কন্ডিশনার নিয়ে সম্পূর্ণ চুলে বিশেষ করে আগার দিকে খুব ভালো করে লাগান।
  4. কন্ডিশনার চুলে সেট করতে মাথায় শাওয়ার ক্যাপ লাগিয়ে ২০-৩০ মিনিট পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। তাড়া থাকলে, কন্ডিশনার সেট করতে চুলে হিট দিতে পারেন।
  5. শাওয়ার ক্যাপ খুলে ঠান্ডা পানি দিয়ে চুল ধুয়ে ফেলুন। এক্ষেত্রে ৩-৫ মিনিট সময় ব্যয় না করলেই নয়। ধোয়ার পর চুলে আর আঠালো ভাব না থাকলে বুঝে নিন কন্ডিশনার ঠিকমতো সেট হয়েছে।

লক্ষ্য রাখুন: কন্ডিশনার শুধু চুলে ব্যবহারের জন্য। ভুলেও মাথার তালুতে লাগাবেন না। চুলে কন্ডিশনার সেট করতে পর্যাপ্ত সময় দিন। খুব বেশি তাড়া না থাকলে এক্ষেত্রে চুলে হিট না দেওয়াই ভালো।

চুলের ধরণ অনুযায়ী সঠিক উপাদানের কন্ডিশনার বেছে নিতে এবং সেইসঙ্গে কন্ডিশনার ব্যবহারের সঠিক নিয়ম মেনে কন্ডিশনিং এ একদম আসলেমি করবেন না। সেইসাথে কন্ডিশনিং এর সময় এর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আপনার নির্বাচিত কন্ডিশনারের প্যাকে দেওয়া নির্দেশনাগুলো মেনে চলুন।

সম্পাদকের বাছাই-

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *